দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে বেহাল অবস্থার চিত্র পত্রিকার পাতা খুললেই আমরা মোটামুটিভাবে দেখতে পাই। এ অবস্থা বোঝার জন্য খুব বেশি বিশেষজ্ঞ হবারও দরকার নেই, দেশের সাধারণ নাগরিক সহ সচেতন সবাই শিক্ষার বিশেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষার পরিস্থিতি নিয়ে কমবেশী অবগত। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা শেষে দক্ষ মানবসম্পদ হয়ে যে শিক্ষার্থী বেরিয়ে আসবার কথা, কার্যত তাদের অধিকাংশই জাতির জন্য বোঝা হিসেবেই বেরিয়ে আসছে! আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে শিক্ষা কারিকুলামে পাঠদান করছি তা যুগোপযোগী নয় এবং আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক ক্ষেত্রেই অচল ও অক্ষম!
আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যা পড়ানো হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে এ শিক্ষার প্রয়োগ নেই। আবার যেগুলোর প্রয়োগ আছে সেগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ভাবে পড়ানো হচ্ছে না। আর সবচেয়ে বড় ত্রুটি রয়েছে শিক্ষাদানে নিয়োজিত শিক্ষকের দক্ষতা ও শিক্ষাদান পদ্ধতি মনিটরিং ব্যবস্থার উপর। এছাড়াও এই শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার জন্য অপরিকল্পিত কারিকুলাম ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও কর্মমুখী শিক্ষা বাদ দিয়ে বা কম গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলের সাধারণ শিক্ষার দিকে জোর দেওয়াই বিশেষভাবে দায়ী।
এছাড়াও শিক্ষাদানের জন্য মেধাবী শিক্ষক না পাওয়া এবং যৎসামান্য পাওয়ার পর তাঁদের ধরে রাখতে না পারার অন্যতম কারণ শিক্ষকদের নগণ্য সম্মানি ও অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান। আমাদের দেশে সবচেয়ে অবহেলার পেশা শিক্ষকতা। এখানে শিক্ষকদের না আছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, না আছে পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা; না আছে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। এই পেশাকে প্রাথমিক ক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণির, মাধ্যমিকের দ্বিতীয় শ্রেণির এবং উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির মর্যাদায় রাখা হয়েছে।
শিক্ষকদের পদমর্যাদার এই বৈষম্য শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদেরকে পিছিয়ে দিচ্ছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের পদমর্যাদা উন্নয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নে উল্লেখ করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি আজও।
অনেকেই যুক্তি দেখাতে পারেন বা শিক্ষকদের পদমর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেন কিন্তু আমরা যদি উন্নত রাস্ট্রগুলোর দিকে দেখি তাহলে যে চিত্র দেখতে পাই- জার্মানি শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কি করেছিল? ‘জার্মানির সবচেয়ে জনপ্রিয় চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল শিক্ষকদের বেতন যখন সর্বোচ্চ করে দিলেন তখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মহল এর কারণ জানতে চাইলে তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন- “আমরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাষ্ট্রনায়ক কিংবা সমাজের বৃহৎ পেশায় নিয়োজিত কিন্তু যাদের হাতে আমাদের বিদ্যার্জনের হাতেখড়ি তাদের কীভাবে আমাদের থেকে কম পারিশ্রমিক দিতে পারি?”
শিক্ষা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিবর্গ মনে করেন শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী করা উচিত। আর এ কাজটি করতে হলে এই মুহূর্তে সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের এবং বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রবেশ পদটি প্রথম শ্রেণির (ক্যাডার) পদমর্যাদায় উন্নীত করা উচিত।
মাউশি’র বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকরা স্বাধীনতার পর থেকেই দ্বিতীয় শ্রেণির পদ মর্যাদা নিয়ে কর্মরত রয়েছেন। যদিও এই মর্যাদা কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০১২ সালে। উল্লেখ্য সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের সমমর্যাদার এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নিচের মর্যাদার পদগুলো নানা সময়ে আপগ্রেড হয়ে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে।
কিন্তু বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের পদটিকে অদ্যাবধি প্রথম শ্রেণির মর্যাদায় উন্নীত করা হয়নি! যদিও এই পদটিকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হওয়া খুবই জরুরী। কারণ বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় উপরের সবগুলো পদই ক্যাডার সিডিউল ভুক্ত।
এছাড়াও শিক্ষকদের কাজে মানসিক আনন্দ এবং পেশায় বৈচিত্র আনতে নির্দিষ্ট সময় পরপর অন্তত ৪ থেকে ৬ ধাপ বিশিষ্ট একটি ক্যারিয়ার পাথ বা পদোন্নতির সিঁড়ি এর সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। আর ৪ থেকে ৬ ধাপ বিশিষ্ট ক্যারিয়ার পাথ করতে সরকারের আর্থিক দায় খুব বেশি বৃদ্ধি হবে না কারণ চাকরি জীবনের শুরুতে একজন শিক্ষক যে বেতন নিয়ে যাত্রা শুরু করেন বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির কারণে চাকরিজীবনের শেষ ধাপ পর্যন্ত তিনি যেভাবে বর্ধিত বেতন পান (সর্বশেষ ২০১৫ পে স্কেল অনুযায়ী পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পান) এই বিষয়গুলোকে সমন্বয় করে পদসোপান তৈরি করা কঠিন নয়।
এ কাজটি করলে একদিকে যেমন শিক্ষকদের পেশায় বৈচিত্র সৃষ্টি হবে তেমনি পেশার প্রতি সন্তুষ্টি আসবে; ফলে মেধাবী মানব সম্পদ শিক্ষকতা পেশার প্রতি আকৃষ্ট হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য- শিক্ষকদেরকে আমরা টেনে নিচে নামাতে নামাতে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছি যে এখন কেউ আর শিক্ষকতা পেশায় আসতেই চাইছে না! তাই মেধাবীদের শিক্ষক বানাতে বা মেধাবীদেরকে এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট করতে এবং ধরে রাখতে মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রবেশ পদকে নবম গ্রেড (ক্যাডার) এবং তাদের পেশায় বৈচিত্র আনতে চার থেকে ছয়টি ধাপে একাডেমিক পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরী। আর এ কাজটি করতে পারলে আমরা যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট যুগে আছি, এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টকে সহজেই মানব সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।
অন্যদিকে, শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কথা যদি বলি তাহলে অবশ্যই শিক্ষা প্রশাসনে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত অভিজ্ঞ জনসম্পদকে নিয়োগ বা পদায়ন করতে হবে। যিনি শিখন বিজ্ঞান বা প্যাডাগজি সম্পর্কে জানেন তাঁর পক্ষেই শিক্ষা প্রশাসক হওয়ার উপযুক্ত এবং এই ধারা আমাদের এই উপমহাদেশে শুরু থেকেই প্রচলিত আছে। এছাড়াও যিনি যে বিষয়ে অভিজ্ঞ তাকে সেই বিষয়ে পরিচালনার দায়িত্ব দিলে সেই কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়।
অনেকের ধারণা- শিক্ষকরা শিক্ষা প্রশাসন চালাতে পারেন না, আমলারা প্রশাসন চালাতে দক্ষ। আমরা এ ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করি। আমাদের মনে রাখতে হবে - খোদ সেনাবাহিনীর শিক্ষা প্রশাসনের পরিচালক কিন্তু শিক্ষা কোরের, ইনফ্যান্ট্রির নয়। তাহলে সিভিলে কেন শিক্ষকগণ নয়? উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে চিকিৎসা প্রশাসনে চিকিৎসকদের থেকে যেমন নিয়োগ হয়, উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে তেমনিভাবে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার থেকে শিক্ষকদের নিয়োগ হয় ঠিক তেমনিভাবে মাধ্যমিকের জন্য বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখার কার্যক্রম পরিচালনায় অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদায়ন দেয়া উচিত।
আর এ কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১ সংশোধন করে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনে মাউশির বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পদায়নের/পদোন্নতির যে সুযোগ আছে সেটিকে গতিশীল করা এবং চেয়ার ভিত্তিক পদোন্নতি প্রথা বাতিল করে পদোন্নতিযোগ্য পদ এবং পদায়নযোগ্য পদ আলাদা করে পদসোপান প্রণয়ন করলে শিক্ষকদের পদোন্নতি পাবার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ কাজটি করলে ২৮/৩০ বছর চাকরি করেও শিক্ষকরা যে পদোন্নতি পাচ্ছেন না বা একই পদ থেকে বৈচিত্রহীন ভাবে নিরানন্দে ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে অবসরে যাচ্ছেন সেই বন্ধ্যাত্ব অন্তত ঘুচবে এবং রাষ্ট্রও দায় মুক্ত হবে।
আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ নৈতিক মূল্যবোধ, জাতীয় ঐতিহ্য ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা তথা উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময় দেশের শিক্ষা নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়। বিভিন্ন সময়ে বিশেষত ১৯৬২ সালের শরিফ শিক্ষা কমিশন, ১৯৭৪ সালের কুদরাত ই খুদা কমিশন, ১৯৯৪ সালের নায়েম পরিচালিত গবেষণা রিপোর্ট, ২০০৩ সালের প্রফেসর মোঃ মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশন, ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কার, মাধ্যমিককের জন্য একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষকদের পদমর্যাদা বাড়ানোর জন্য কিছু সুপারিশ পেশ করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এতগুলো কমিশন ও শিক্ষা নীতির সুপারিশমালা পূর্বের কোনো সরকারই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন বা পরিবর্তন ঘটেনি। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশেষত মাধ্যমিক শিক্ষার মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ২০০৩ সালে গঠিত প্রফেসর মোঃ মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ (২৭ নং অধ্যায়ের ৬ নং কলাম পৃষ্ঠা-৬৪) এর আলোকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ভেঙে দুইটি আলাদা অধিদপ্তর যথা বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখার নেতৃত্বে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কলেজ শাখার নেতৃত্বে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর গঠন করা।
সেইসাথে শিক্ষা কার্যক্রম সঠিক বাস্তবায়নে রুট লেভেল পর্যন্ত মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করতে প্রাথমিকের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে শিক্ষা পরিদর্শক ও নিয়ন্ত্রক এবং মাধ্যমিকের জন্য বিদ্যমান বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখাকে যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করা উচিত। কারণ এত বিশাল সংখ্যক (ব্যানবেইজ পরিসংখ্যান ২০২২ অনুযায়ী “দেশে বর্তমানে ২০,৩৫৩ টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং ৪,৭৪৭টি কলেজ বা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
অর্থাৎ এতো বিপুল সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কয়েক লাখ শিক্ষকের কার্যক্রমের তদারকি, চাকুরী ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা রক্ষা, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, পরিদর্শন ও যথাযথ মনিটরিং করা মাউশির মাধ্যমিক উইং এ কর্মরত এই স্বল্প সংখ্যক জনবল দিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। উল্লেখ্য ১,৮০০ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা “কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর” এবং ৯.৬০৬টি মাদ্রাসার জন্য আলাদা “মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর” গঠন করা হলেও প্রায় ২১ হাজারের কাছাকাছি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য জাতীয় সংসদে পাস হওয়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী মাধ্যমিকের জন্য একটি আলাদা অধিদপ্তরের উদ্যোগ না নেওয়াটা অস্বাভাবিক নয় কী?
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ শাখা এবং বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখার এর মধ্যে বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত শিক্ষক/কর্মকর্তাদের ইতিহাস খুবই শোষণ-বঞ্চনার। এ যেন স্বাধীন দেশেই আরেক উপনিবেশবাদের গল্প। দীর্ঘদিন ধরে শোষণের শিকার মাধ্যমিক যেন কলেজ শাখার কলোনীতে পরিণত হয়েছে! শোষণ-বঞ্চনার বলছি এজন্য যে এখানে কর্মরত শিক্ষক/কর্মকর্তাগণ অপ্রাপ্তির নানা ধরণের হতাশায় নিমজ্জিত। তবে কলেজ শাখার সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সংখ্যায় কম হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (শিক্ষা ভবনের) ৯৫ ভাগের বেশি পদে কলেজ শিক্ষকগণ (শিক্ষা ক্যাডার) বসে আছেন।
সঙ্গত কারণে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮১% মাউশি’র অধীনে মোট প্রতিষ্ঠানের) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের গতি মন্থর হয়ে রয়েছে। তাছাড়া মাউশিতে কর্মরত প্রায় সকল কর্মকর্তা (প্রকৃত অর্থে মাত্র ৩টি পদ ব্যতীত) কলেজ শিক্ষক (সা. শিক্ষা ক্যাডার) হওয়ায় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকগণ অধিদপ্তরে তাঁদের দাপ্তরিক কাজের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সুবিধা পান না বরং উল্টো অনেক ক্ষেত্রেই নানা ধরণের হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হন। ফলে বিশাল কলেবরে মাউশি মাধ্যমিক শিক্ষার উপর ঠিকমত নজর দিতে পারছেই না বিপরীত দিকে উচ্চ শিক্ষার মানও তলানিতে এসে পৌঁছেছে।
ফলে দেশের শিক্ষা কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। মাউশি এবং ফিল্ড পর্যায়ে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল সংকট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার কারণে বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা প্রায় ভঙ্গুর!
তাই মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকগণ মনে করেন- জাতীয় ২০০৩ সালে গঠিত প্রফেসর মোঃ মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এবং শিক্ষানীতি ২০১০ এর নির্দেশনা মোতাবেক মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উন্নয়ন এবং দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করতে মাধ্যমিকের জন্য একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। সংবিধানের মূল চেতনাকে সমুন্নত রাখা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৪ অর্জনে এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এর কার্যক্রম টেকসইভাবে পরিচালনার জন্য এবং একই সাথে শিক্ষকতা পেশার প্রবেশ পদে সমতা বিধানের জন্য এমপিও শিক্ষকদেরকেও পর্যায়ক্রমে ৯ম গ্রেডে এবং বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) সিডিউল ভুক্ত বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখার সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সমূহে কর্মরত সহকারী শিক্ষক/ শিক্ষিকার প্রবেশ পদটিকে এখনই নবম গ্রেডের বিসিএস সাধারন শিক্ষা ক্যাডারে উন্নীত করা একান্ত প্রয়োজন।
এছাড়াও শিক্ষকদের কাজে বৈচিত্র আনতে চাকুরী জীবনে সবেচেয়ে বড় আকাঙ্খা পদোন্নতি প্রথা চালু করতে ৪/৬ টি ধাপ বিশিষ্ট পদসোপান বাস্তবায়ন করা অতীব প্রয়োজন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের রিপোর্টেও মাধ্যমিকের জন্য একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন বাংলাদেশে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনে ২০০৩ সালে গঠিত প্রফেসর মোঃ মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি দ্রুতই করবেন বলে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বিদগ্ধজন মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন।
পরিশেষে বলা যায় মাধ্যমিক শিক্ষায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে এবং যোগ্য ও দক্ষতা সম্পন্ন শিক্ষকদের ধরে রাখতে সহকারী শিক্ষকদের প্রবেশ পদটি নবম গ্রেডে উন্নীতকরণের কোনো বিকল্প নেই। আর সেজন্য প্রয়োজন একটি যুগোপযোগী পদসোপান। একই সাথে মাধ্যমিক শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নামে একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন অতীব জরুরী।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যা লয়, খুলনা;
ও
মূখপাত্র, স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশ।
"এই বিভাগে প্রকাশিত মুক্তমতের সকল দায়ভার লেখকের নিজের। ক্যাম্পাস বাংলা কোনভাবেই এই বিভাগের লেখক কিংবা লেখার বিষয়বস্তুর দায়ভার নিচ্ছে না।"
