ছবি : সংগৃহীত
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারিদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের ‘কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টার’, অর্থ অপচয়ের কারখানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আয়োজন করা প্রশিক্ষণগুলো যেন বনভোজন বা পিকনিকে পরিণত হয়েছে। যাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একাডেমিক জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নেই তারাই এখানে হচ্ছেন প্রশিক্ষক। সরকারের কর্মকর্তারা বিষয় সংশ্লিষ্ট না হলেও এসব প্রশিক্ষণে ট্রেইনার হয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা আয় করছেন। এতে প্রশিক্ষনার্থী শিক্ষক-কর্মচারিদের দক্ষতার উন্নয়ন না হলেও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন কর্মকর্তারা।
আওয়ামী আমলে হবিগঞ্জ ও কুমিল্লার জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ কামরুল হাসান (৩১ অক্টোবর ২০১৯ থেকে ২ নভেম্বর ২০২২)। এরপর তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। একইসঙ্গে কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
এসময়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে উড়ে গিয়ে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও কামরুল ইসলাম ‘ইংরেজি বিষয়ে যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন’, ‘ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ’, ‘এ্যাডভান্স আইসিটি’ সকল বিষয়ের রিসোর্স পারসন ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে- দায়িত্বকালিন সময়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কক্সবাজারে গিয়ে ৪/৫ টি করে ক্লাস নিয়েছেন তিনি। আর এতে অধিদপ্তরে মূল চাকরির বাইরে কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টার থেকেই মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন।
মোহাম্মদ কামরুল হাসান বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে- কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারের প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনে লবিং, গ্রুপিং এবং পছন্দের ব্যক্তিদের দেওয়া হয় প্রাধান্য দেয়া হয়। বিষয় সংশ্লিষ্ট না হলেও কামরুলের কাছের ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে অর্থ আয় করেছেন। লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টার কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা থাকলেই যেকেউ এখানে প্রশিক্ষক হিসেবে অর্থ আয় করতে পারেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ কামরুল হাসানের এসব অনিয়মের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে তাকে মোবাইলে কল ও মেসেজ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, কোনো উত্তরও করেননি।
নাম প্রকাশ না করে এক প্রশিক্ষণার্থী প্রতিবেদককে বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এই কর্মকর্তারা অভিজ্ঞ না হলেও বাধ্য হয়ে তাদের কাছেই প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। এর ফলে সরকারের অর্থের অপচয় হলেও আমরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ করতে পারছি না- অভিযোগ করেন তিনি।
সূত্র জানায়- আগে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষক, কর্মচারিদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হতো। গত প্রায় এক বছর ধরে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ বাদ দিয়ে কক্সবাজারে ‘লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টার’ এসব প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বিলাসী বাজেটের এসব প্রশিক্ষণে ব্যয় হচ্ছে সরকারের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।
এশিয়া পোস্টের হাতে থাকা নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে- গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে ২৫ জন শিক্ষকদের ১০ দিনের ’ইনডাকশন’ প্রশিক্ষণে ব্যয় হয় ২ লাখ ৭৯ হাজার ৩৮০ টাকা। একই সময়ে ৩০ জন শিক্ষকের ১০ দিনের ‘ইংরেজি বিষয়ে যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রশিক্ষণে ১০ লাখ ৮২ হাজার ২০০ টাকা খরচ করেছে কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টার। অর্থাৎ একটি ব্যাচেই ৮ লাখ ২ হাজার ৮২০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারে ইংরেজি বিষয়ে যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে মোট ৮ ব্যাচ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। সে হিসেবে জেলা/উপজেলা ট্রেনিং সেন্টারের খরচের চেয়ে মোট ৬৪ লাখ ২২ হাজার ৫৬০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে- যা সরকারি টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলা পর্যায়ে শিক্ষকদের ১৪ দিনের ‘আইসিটি ইন এডুকেশন’ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সারাদেশে মোট ৪৮০ টি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় শিক্ষকদের। প্রতি ব্যাচে মাত্র ২৫ জন শিক্ষকের পেছনে প্রশিক্ষণে ব্যয় হয় ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৭০০ টাকা। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারে ৩০ জন শিক্ষকের মাত্র পাঁচ দিনের এ্যাডভান্স আইসিটি প্রশিক্ষণে খরচ করা হয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ১০০ টাকা।
অর্থাৎ কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারের ৫ দিনের প্রশিক্ষণের ব্যয় জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত ১৪ দিনের প্রশিক্ষণের ব্যয়ের চেয়ে প্রায় ২ লাখ টাকা বেশি ।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারে ’আইসিটি‘ বিষয়ে মোট ৯টি ব্যাচ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে, যাতে মোট ৫০ লাখ ৪১ হাজার ৮৬৩ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা পর্যায়ে ২৫ জন প্রধান শিক্ষকের ১৪ দিনের ’লিডারশিপ‘ প্রশিক্ষণে মোট ব্যয় হয়েছে ৫ লাখ ৫৮০ টাকা। অথচ কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারে ৩০ জন প্রধান শিক্ষকের মাত্র পাঁচদিনের লিডারশিপ প্রশিক্ষণে বরাদ্দ করা হয়েছে ৭ লাখ ৭১ হাজার ৩০০ টাকা ।
কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারের ৫ দিনের প্রশিক্ষণের ব্যয় উপজেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত ১৪ দিনের প্রশিক্ষণের ব্যয়ের চেয়েও প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৭২০ টাকা বেশি ।
প্রাথমিক অধিদপ্তর সূত্র জানায়- ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারে এ্যাডভান্স লিডারশিপ বিষয়ে মোট ১০ টি ব্যাচ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে- যাতে মোট ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ২১০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সঞ্জীবনী, আধুনিক অফিস ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মোট ৩৭ ব্যাচ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। যেখানে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের তুলনায় কয়েক কোটি টাকা বেশি খরচ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন- সরকার বিভিন্ন খাতে একদিকে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করছে, সেখানে কক্সবাজার লিডরিশিপ ট্রেনিং সেন্টার ব্যয় সম্প্রসারণ নীতি অনুসরণ করে স্বাভাবিক খরচের চেয়ে ৪ থেকে ৫ গুণ বেশী খরচ করছে। আর এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে।
ট্রেনিংয়ের নামে অতিরিক্ত অর্থ অপচয়, অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক না থাকাসহ নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টার উপ-পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. কামরুজ্জামান বলেন, আমি গত জুলাইয়ে এখানে যোগদান করেছি। গতবছর বেশ কিছু ট্রেনিং হয়েছে, তখন এই লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারে সরকারি বিধি মোতাবেক কস্ট সেন্টার ছিল না। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, কক্সবাজারের কাছে বরাদ্দ দিয়ে ট্রেনিংগুলো চালিয়েছে।
তিনি বলেন, এই ট্রেনিং সেন্টারটি এখনো অফিশিয়ালি হস্তান্তর হয়নি। সরকারের অনেক দপ্তর এই ট্রেনিং সেন্টারটি নিতে চেয়েছিল। সেন্টারটি যাতে প্রাথমিক মন্ত্রণালয়ের হাতছাড়া না হয় তাই গত বছর দ্রুত ট্রেনিং শুরু করা হয়েছিল। এজন্য বেশকিছু অনিয়ম, অসঙ্গতি হয়ে থাকতে পারে।
উপ-পরিচালক আরও বলেন, বিষয় সংশ্লিষ্ট ও অভিজ্ঞদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে ট্রেইনারদের একটি পুল গঠন করা হবে। ইতোমধ্যে আমরা গুগল ফর্মের মাধ্যমে ট্রেইনার আবেদন আহ্বান করেছি। এখন থেকে যোগ্য ও বিষয় সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা ছাড়া কেউ ট্রেইনার হতে পারবেন না।
এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের নামে অর্থ অপচয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সারাদেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়াও উপজেলা শিক্ষা অফিসার, এটিও, ইউআরসি, পিটিআইসহ অনেক দপ্তরে আরও কর্মকর্তা রয়েছেন। সব শিক্ষক কর্মকর্তাকে তো আর বিদেশে বা বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণে পাঠানো সম্ভব না। তাই তাদের এ্যাডভান্স লেভেলের প্রশিক্ষণের জন্য কক্সবাজারে পাঠানো হয়। সারাদেশের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের কক্সবাজারে ট্রেনিং করানো হলে কিছুটা ব্যয় বাড়লেও তাদের কর্মদক্ষতা বাড়ে বলে মন্তব্য করেন এ উপ-পরিচালক।
খবর : এশিয়া পোস্ট।
