নিয়মের যেন কোনো বালাই নেই ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনিয়মই নিয়ম এখানে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যেনতেনভাবে দেওয়া হয়েছে নিয়োগ। শর্ত পূরণ না করলেও দেওয়া হয়েছে উপপরিচালক, উপ-রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন পদে পদোন্নতি। প্রভাষক হিসেবে পাঁচ বছর পার না করেও অনেকে হয়েছেন সহকারী অধ্যাপক। বিধি লঙ্ঘন করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতি নিয়েছেন ১০১ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা। আর প্রাপ্যতা না থাকলেও ইনক্রিমেন্ট বাগিয়ে নিয়েছেন ১০৩ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা।
ভার্চুয়াল সভা করেও সাবেক ভিসি-প্রোভিসি-ট্রেজারার নিয়েছেন সম্মানি! ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। একের পর এক অনিয়মে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এ ছাড়াও অনেক অনিয়মের যেন আখড়ায় পরিণত হয়েছে ইসলামি উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রক এ বিদ্যাপীঠ।
বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে সম্প্রতি অডিট কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন হাতে পেলে এ ব্যাপারে মন্তব্য করা যাবে।
- প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান, উপাচার্য
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় অডিটের উপ-দলনেতা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অডিট একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। অডিট কার্যক্রম শেষ করে বেশ কিছু অনিয়মের ব্যাপারে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব জানতে চাওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ন্যূনতম অভিজ্ঞতা না থাকলেও পেয়েছেন নিয়োগ, পরবর্তী সময়ে নিয়েছেন পদোন্নতিও। আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই কর্মকর্তা এমন অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়েছেন ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩২ টাকা। এঁরা হলেন উপপরিচালক জিয়াউর রহমান ও উপ-রেজিস্ট্রার ফাহাদ আহমদ মোমতাজী।
২০১৬ সালের নভেম্বরে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী পরিচালক, সহকারী রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য সেকশন অফিসার বা সমপর্যায়ের গ্রেডে পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয় এ পদে, পরবর্তী সময়ে দেওয়া হয় পদোন্নতিও। শর্ত অনুযায়ী সহকারী রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থীকে সেকশন অফিসার বা সমপর্যায়ের পদে পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু আবেদনকালে ফাহাদ আহমদ মোমতাজির চাকরির অভিজ্ঞতা তিন বছর দুই মাস কম থাকলেও তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনিও বাগিয়ে নিয়েছেন পদোন্নতি।
অডিট একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। অডিট কার্যক্রম শেষ করে বেশ কিছু অনিয়মের ব্যাপারে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব জানতে চাওয়া হয়েছে।
- তোফাজ্জল হোসেন, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী পদোন্নতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট প্রদানের সুযোগ নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের এ আদেশ লঙ্ঘন করে ইনক্রিমেন্ট নিয়েছেন ১০৩ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। আর এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৯৬ লাখ ৬৯ হাজার ৩৮৫ টাকা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৩৪তম ও একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে ১০১ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। এই অনিয়মের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬ টাকা। ২০২৫ সালে পদোন্নতি পেলেও বিধিবহির্ভূতভাবে তাদের অনেকের পদোন্নতি কার্যকর করা হয়েছে ছয় বছর আগে থেকে।
নিয়ম অনুযায়ী নবম গ্রেডের থাকা ব্যক্তিদের ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু চাকরির ন্যূনতম মেয়াদ পূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় বেতন স্কেল অমান্য করে পাঁচজন প্রভাষককে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। পদোন্নতিপ্রাপ্তরা হলেন সহকারী অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম, জাহেদ উল্লাহ, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, আশফাক আখতার ও হারুনুর রশিদ। বিধি অমান্য করে পদোন্নতি নেওয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩৬ লাখ ৪২ হাজার ৯১৫ টাকা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা (উপ-রেজিস্ট্রার) মো. আইউব হোসেনকে লিয়েনে নিয়োগ দেওয়া হয় তৃতীয় গ্রেডে (রেজিস্ট্রার)। নিয়োগের শর্তমতে, শেষ বেতনের প্রত্যয়ন অনুযায়ী (পঞ্চম গ্রেডে) বেতন নেওয়ার কথা থাকলেও বিধিবহির্ভূতভাবে তৃতীয় গ্রেডের বেতন তুলে নিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামে অধ্যাপক পদটি তৃতীয় গ্রেডের হলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মদ অলি উল্লাহকে গ্রেড-১ অধ্যাপক হিসেবে লিয়েনে নিয়োগ দিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে বেতন দেওয়া হয়েছে। লিয়েনের দুই নিয়োগে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা পরিশোধ করায় গত অর্থবছরে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬ লাখ ৩০ হাজার ১৪৮ টাকা। চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ নীতিমালা লঙ্ঘন করে পিআরএলে যাওয়া কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামানকে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এই অনিয়মের ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২১ লাখ ২১ হাজার ২৯৩ টাকা।
তথ্যমতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটির ১৯তম সভা পরিচালনা করা হয় জুম প্ল্যাটফর্মে। ভার্চুয়াল মিটিং করেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুর রশিদ, সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এস এম এহসান কবীরসহ ১২ জন অনিয়ম করে তুলে নিয়েছেন ৩০ হাজার ২৫০ টাকার সম্মানি। এ ছাড়া পদোন্নতি ও নিয়োগ সভার কাজে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে প্রাপ্যতার চেয়ে অতিরিক্ত ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা সম্মানি তুলে নিয়েছেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল আলম, সাবেক উপ উপাচার্য মোহাম্মদ আবু জাফর খান (বর্তমানে উপাচার্য), উপ উপাচার্য অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম, ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ অলি উল্লাহ, সাবেক রেজিস্ট্রার আইউব হোসেনসহ অন্যরা।
স্বশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ডিন ভাতা বা গবেষণা ভাতা না থাকলেও অধ্যাপক মোহাম্মদ অলি উল্লাহ অবৈধভাবে আদায় করেছেন ডিন ভাতা। অধ্যাপক শাযযাত উল্লাহ ফারুকী বিধিবহির্ভূতভাবে তুলে নিয়েছেন ডিন ভাতা ও গবেষণা ভাতা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা। ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক বরাদ্দের চেয়ে বাড়তি খরচ করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬ কোটি ৯১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। একই অর্থবছরে বিল-ভাউচারে দেখা গেছে কাগজ ক্রয় ও মুদ্রণ খাতে বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ১১ লাখ ২৫ হাজার ২৪২ টাকা।
চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কম আয়কর আদায় করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ১১৮ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক অনিয়ম সংঘটনের অডিট প্রতিবেদন প্রসঙ্গে উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান বলেন, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে সম্প্রতি অডিট কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন হাতে পেলে এ ব্যাপারে মন্তব্য করা যাবে।
খবর: বাংলাদেশ প্রতিদিন।
