ছবি : এআই দিয়ে তৈরি
ভালোবাসার সম্পর্ক থেকে বিয়ে। সংসার টিকিয়ে রাখতে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির টাকায় স্ত্রীর নামে কিনে দিয়েছিলেন ৩২ লাখ ২৬ হাজার টাকার ফ্ল্যাট। কিন্তু অভিযোগ, এরপরও অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে স্ত্রী ঘর ছাড়েন। সঙ্গে নিয়ে যান নগদ পাঁচ লাখ টাকা, ১২ ভরি স্বর্ণালংকার ও চার বছরের সন্তানকে। সব মিলিয়ে প্রায় ৬১ লাখ টাকার সম্পদ হারিয়ে এখন দিশাহারা কলেজশিক্ষক মো. ইকবাল হোসেন।
কুমিল্লা সদর উপজেলার ইবনে তাইমিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক মো. ইকবাল হোসেনের করা মামলার তদন্তে তাঁর স্ত্রী ফাহিমা আক্তারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ছয়টি ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
আদালতে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত অন্য ছয়জন হলেন—ফাহিমা আক্তার (২৫), তাঁর বাবা মোহাম্মদ সেলিম (৫২), মা লুৎফুন নাহার ওরফে লাভলী (৪২), ভাই ফারহান হোসেন (২৩), চাচি খাদিজা বেগম ওরফে রুমা (৪৩), দাদি অহিদা বেগম (৭৩) এবং তদন্তে নতুন করে অভিযুক্ত পরকীয় প্রেমিক মো. রেদোয়ান আহমেদ (২৫)।
প্রতিবেদনে তাঁদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, চুরি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অপরাধে সহায়তার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইকবাল হোসেনের অভিযোগ, ফাহিমাদের বাড়ী চাঁদপুরের হাজিগঞ্জ থানার এন্নাতলী গ্রামে। কিন্তু তারা কুমিল্লায় ভাড়া বাসায় থাকতো। প্রাথমিক পরিচয়ের সূত্র ধরে উভয়ের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক হয়। ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ফাহিমার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর ফাহিমা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বলে কুমিল্লা শহরে ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার জন্য চাপ দেন।
সেই প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার দক্ষিণ দুর্গাপুর এলাকার আইডিয়াল প্যালেসের তৃতীয় তলার ১১৩০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ৩২ লাখ ২৬ হাজার টাকায় ফাহিমার নামে কেনেন তিনি। ফ্ল্যাট কেনার পরও পারিবারিক অশান্তি চলতে থাকে। ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি কলেজে পাঠদানে ব্যস্ত থাকার সময় তাঁর ভাড়া বাসা থেকে পাঁচ লাখ টাকা, ১২ ভরি স্বর্ণালংকার—যার আনুমানিক মূল্য ২৪ লাখ টাকা—এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ফাহিমা চলে যান। সঙ্গে নিয়ে যান তাঁদের চার বছরের সন্তান ইরফানকেও।
অভিযোগে বলা হয়, ফাহিমার সঙ্গে রাসেল হোসেনের পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার আমুজান বাজারের একটি খাবার হোটেলে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও করেন ইকবাল।
তদন্ত প্রতিবেদনে ফাহিমা আক্তারের বিরুদ্ধে বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে ফ্ল্যাট কেনানোর মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়া এবং বাসা থেকে টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ সেলিম, মা লুৎফুন নাহার ও ভাই ফারহান হোসেনের বিরুদ্ধে ইকবালকে চাপ দেওয়া, হুমকি ও হয়রানিতে সহযোগিতা এবং ঘটনাগুলোতে প্ররোচনার অভিযোগ তদন্তে বিবেচনা করা হয়েছে।
একইভাবে খাদিজা বেগম ও অহিদা বেগমের বিরুদ্ধে পারিবারিকভাবে চাপ প্রয়োগ ও ঘটনাসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার অভিযোগও প্রতিবেদনে এসেছে।
তদন্তে নতুন করে অভিযুক্ত মো. রেদোয়ান আহমেদের বিরুদ্ধে ফাহিমার সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় তিনি বাংলাদেশে ছিলেন; বর্তমানে সার্বিয়ায় অবস্থান করছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৯৭, ৩৮০, ৫০৬ ও ১০৯ ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ৪৯৮ ধারার অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনার কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে।
এদিকে, ফাহিমার করা যৌতুক মামলায় ইকবালকে জড়ানোর কথাও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর ইকবাল তালাকের নোটিশ পান বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নাজিউল ইসলাম তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ফাহিমা আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। তার মা লুৎফুন্নাহারের কাছে জানতে চাইলে উল্টো তিনি প্রশ্ন করেন, ফ্লাট এবং টাকা নিয়ে আসার কোনো প্রমাণ কি তাদের কাছে আছে? এই বলেই ফোন রেখে দেন তিনি। এরপর আর ফোন রিসিভ করেন নি।
মামলার বাদী ইকবাল হোসেন বলেন, আমি প্রতারিত হয়েছি। আমি ন্যায় বিচার চাই।
